দাবার ইতিহাস: চতুরঙ্গ



চতুরঙ্গ, কেবল একটি খেলা নয়; এটি ভারতবর্ষের বুদ্ধিবৃত্তি, কৌশলচিন্তা ও সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতার এক অনন্য প্রতিফলন। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তাশীল সমাজে খেলাধুলা ছিলো কেবল বিনোদন না, তা ছিলো রাজনীতি ও যুদ্ধনীতির অনুশীলন ক্ষেত্র; তাই চতুরঙ্গের মত একটি জটিল কৌশলগত খেলা ভারতীয় রাজপ্রাসাদ ও বৌদ্ধিক মণ্ডল থেকে উৎপাত লাভ করাটা আশ্চর্যের কিছু না, বরং প্রত্যাশিত। স্থানীয় কবিতা, নীতিবোধ ও শিক্ষার পরিধিতে খেলা ছড়িয়ে পড়ে; মেধাবী খেলোয়াড় ও শিক্ষকরা এটিকে কৌশলচর্চা, ধৈর্যশিক্ষা ও সৃজনশীল চিন্তার এক মাধ্যম হিসেবে দেখতেন। এমন প্রেক্ষাপটে চতুরঙ্গ জন্মে ভারতবর্ষের ঐতিহ্যগত জ্ঞানের উর্বর মাটিতে বিকশিত হয়ে, এটি সময়ের সাথে আরও পরিশীলিত ও সমৃদ্ধ হয়।

ভারতবর্ষ কেবল চতুরঙ্গের জন্মস্থলই নয়; এই খেলার মাধ্যমেই দেশের বৌদ্ধিক ও সংস্কৃতিক ভাবনা বিশ্বমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। পারস্যে চলে গিয়ে সেটি শতরঞ্জ নাম পায়, আর এরপর আরব ও ইউরোপ হয়ে আধুনিক দাবায় রূপান্তরিত হয়- তবুও মূল সৃজনশীল ভাবনা ও কৌশলগত ধারণার প্রাণটা ছিলো ভারতীয়। চতুরঙ্গ সেজন্য ভারতের কৌশলগত বোধ এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের এক দীপ্ত প্রতীক; হাজার বছরের ইতিহাসে এই খেলাটি ভারতীয় মেধার এক গৌরবোজ্জ্বল শংসাপত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এই ব্লগে আমরা স্টেপ বাই স্টেপ জানব কীভাবে ভারতীয় মাটিতে উৎপত্তি করে চতুরঙ্গ বিশ্ববলয়ে প্রভাব ফেলল, এবং সেই পরিবর্তনের পেছনে ছুটে থাকা ঐতিহাসিক কাহিনী ও পরিবেশগুলো, শুরু করছি সেই যাত্রা থেকে।

চতুরঙ্গ, নামটা শুনলে বুঝে যাবার কথা যে, এটা সংস্কৃত শব্দ, যার অর্থ চারটি বিভাগ। মূলত সামরিক বাহিনীর চারটি বিভাগের নামে চতুরঙ্গের নামকরণ। বাহিনীগুলো যথাক্রমে পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তি ও রথবাহিনীকে নির্দেশ করে। আধুনিক দাবা খেলায় যেগুলো যথাক্রমে সৈন্য (বা বোড়ে), ঘোড়া, হাতি (বা গজ) ও নৌকাকে প্রতিনিধিত্ব করে। চতুরঙ্গের জন্ম আনুমানিক গুপ্ত যুগে (চতুর্থ–ষষ্ঠ শতাব্দী খ্রিস্টাব্দ)। খেলার মাধ্যমে রাজপুত্র ও অভিজাতদের যুদ্ধকৌশল, ধৈর্য ও বুদ্ধিবৃত্তি অনুশীলন করানো হতো। ফলে এটি ছিল কেবল বিনোদনের উপায় নয়, বরং সামরিক ও কূটনৈতিক শিক্ষার এক বিকল্প মাধ্যম। ভারতীয় সমাজে এর প্রচলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে; রাজপ্রাসাদ থেকে পণ্ডিতসমাজ, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

আবুল কাসিম ফেরদৌসী তুসী, Public domain, উইকিমিডিয়া কমন্স দ্বারা


 Persianmss14thCambassadorfromIndiabroughtchesstoPersianCourt

চতুরঙ্গের বিস্তারের এক অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় চতুর্দশ শতাব্দীতে অঙ্কিত ফেরদৌসীর শাহনামার কয়েকখানা চিত্রে, যেখানে দেখা যায় ভারতবর্ষের দূত পারস্য সম্রাট নরশেওয়াঁকে (খসরু প্রথম) খেলার নিয়ম উপস্থাপন করছেন। এটি শুধু খেলার ইতিহাস নয়, ভারতবর্ষ ও পারস্যের সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক উজ্জ্বল দলিল। ভারতীয় দূতেরা চতুরঙ্গকে উপহার হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন, আর এর বিনিময়ে পারস্য রাজদরবার থেকে ফেরত আসে এক নতুন খেলা, নর্দ বা পাশা-ভিত্তিক টেবিল গেম। এভাবে চতুরঙ্গ ভারতীয় সভ্যতা থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মাধ্যম হয়ে ওঠে। ভারতীয়দের মেধা ও কৌশলচিন্তা পারস্যের রাজসভায় প্রবেশ করল এবং সেখান থেকেই শুরু হলো এর দীর্ঘ ভ্রমণ, যা ধাপে ধাপে নতুন রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ জুড়ে।

চতুরঙ্গ খেলা হতো একটি ৮×৮ ঘরের অচেকার্ড বোর্ডে, যাকে বলা হতো অষ্টাপদ। এ বোর্ডে বিশেষ কিছু চিহ্ন থাকলেও সেগুলোর প্রকৃত মানে আজ আর জানা যায় না। গবেষকরা মনে করেন, এগুলো আসলে বোর্ডের প্রাচীন রূপে ব্যবহৃত অন্য কোনো পাশা-ভিত্তিক দৌড়ের খেলায় কাজে লাগত। তবে চতুরঙ্গ খেলার জন্য এই চিহ্নগুলো অপ্রাসঙ্গিক ছিল, স্রেফ ঐতিহ্যগতভাবে বোর্ডে থেকে গেছে।

চতুরঙ্গেও দাবার মতোই সাদা পক্ষ প্রথমে চাল দেয়। খেলার মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের রাজাকে ফাঁদে ফেলে পরাস্ত করা বা প্রতিপক্ষকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া যেখানে তার রাজা ছাড়া আর কোনো ঘুঁটি অবশিষ্ট থাকে। তবে যদি পরের চালেই প্রতিপক্ষও একইভাবে বিপরীত পক্ষকে শুধু রাজার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলতে পারে, তাহলে খেলা ড্র হিসেবে গণ্য হয়। চতুরঙ্গের ঘুঁটি দাবার মতোই দুই সারিতে সাজানো হতো। তবে বিশেষ পার্থক্য হলো, রাজারা সরাসরি মুখোমুখি থাকত না। উদাহরণস্বরূপ, সাদা রাজা থাকত e1 ঘরে, আর কালো রাজা থাকত d8 ঘরে। এর ফলে দুই রাজার মধ্যে সরাসরি সম্মুখসমর তৈরি হতো না, বরং কৌশল ও ঘুঁটির অবস্থান দিয়ে খেলার রূপ তৈরি হতো।

চতুরঙ্গের ছয় ধরনের ঘুঁটি ছিল, যেগুলো প্রাচীন ভারতীয় সামরিক শক্তির প্রতীক:

  • পদাতিক/ভাটা: দাবার সৈন্যের মতোই সোজা সামনে এক ঘর চলতো এবং তির্যকভাবে আক্রমণ করতো। তবে প্রথম চালের সময় দ্বিগুণ অগ্রসর হওয়ার সুযোগ ছিল না। বোর্ডের শেষ প্রান্তে পৌঁছালে পদাতিক কেবলই মন্ত্রী (সেনাপতি/ফেরজ)-এ উন্নীত হতে পারতো। তবে মন্ত্রীর ক্ষমতা তখন খুব সীমিত ছিল, শুধু তির্যকভাবে এক ঘর চলতে পারতো। ফলে আধুনিক দাবার রানীর মতো সর্বশক্তিমান হয়ে যেত না।
  • রাজা: দাবার মতোই যেকোনো দিকে এক ঘর যেতে পারে। তবে ক্যাসলিংয়ের নিয়ম ছিল না।
  • মন্ত্রী বা সেনাপতি: যেটাকে আমরা বর্তমানে রাণী বলি। তির্যক (ডায়াগোনাল) যেকোনো দিকে এক ঘর চলতে পারতো। এটা তখন সবচেয়ে দুর্বল ঘুঁটি ছিলো। এটি পরবর্তীতে শতরঞ্জে “ফেরজ” নামে পরিচিত হয়।
  • রথ: দাবার নৌকার মতোই সোজা আনুভূমিক বা উল্লম্বভাবে অসীম ঘর অতিক্রম করতে পারতো।
  • গজ বা হাতি: প্রাচীন গ্রন্থে এর চলন নিয়ে ভিন্ন মত পাওয়া যায়—
    1. তির্যকভাবে দুটি ঘর লাফিয়ে চলতে পারতো, শতরঞ্জের আলফিলের ন্যায়।
    2. এক ঘর সোজা সামনে বা এক ঘর তির্যকভাবে চলতে পারতো, যেমন বার্মিজ বা থাই ভ্যারিয়েন্টে দেখা যায়।
    3. কোনো কোনো সূত্রে উল্লম্ব বা আনুভূমিকভাবে দুটি ঘর লাফানোর উল্লেখ আছে।
  • অশ্ব: দাবার ঘোড়ার মতোই এক ঘর সোজা ও তারপরে এক ঘর বাঁক নিয়ে (L-আকৃতিতে) চলতে পারতো।

পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করবো, কীভাবে চতুরঙ্গ শতরঞ্জে রূপান্তরিত হলো এবং সেই থেকে আধুনিক দাবার উদ্ভব ঘটল।

Abrarul Hasan

Who is me? Your brother from Bangladesh.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন