বিকেন্দ্রীকরণ শিক্ষার জন্য কেন্দ্রীভূত ভর্তি পরীক্ষা!

 উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের এমএ/এমএসএস ভর্তি পরীক্ষা ২০২৪-২৫ সম্পর্কে লিখিত প্রতিবেদন

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি মহৎ ও যুগান্তকারী দর্শন নিয়ে। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২ অনুযায়ী, “সকল পর্যায়ের শিক্ষায় জনগণের প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত ও ত্বরান্বিত করিবার উদ্দেশ্যে” এই প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। এই আইনের মূল ভিত্তি হলো দূরশিক্ষণ পদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষাকে প্রথাগত কাঠামোর বাইরে নিয়ে যাওয়া এবং দেশের সেইসব জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া, যারা ভৌগোলিক দূরত্ব, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, বয়স বা কর্মজীবনের কারণে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় অংশ নিতে পারেন না। বাউবির মূল দর্শনই ছিলো শিক্ষাবঞ্চিত, কর্মজীবী ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনে সহায়তা করা।

এই প্রাতিষ্ঠানিক দর্শনের আলোকে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ভাষা স্কুল পরিচালিত মাস্টার্স অব আর্টস (MA) এবং মাস্টার্স অব সোশ্যাল সায়েন্স (MSS) প্রোগ্রামের ভর্তি পরীক্ষা ঢাকার শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাকার আঞ্চলিক কেন্দ্র, যাদের জন্য গাজীপুর ভ্রমণ তেমন কঠিন নয়, বিপরীতে বাকিদের জন্য শুধুমাত্র গাজীপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাসে কেন্দ্রীভূতভাবে আয়োজনের সিদ্ধান্তটি গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। এই সিদ্ধান্তটি বাউবির সুপ্রতিষ্ঠিত বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোর সঙ্গে দৃশ্যত সাংঘর্ষিক এবং এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলনীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান শক্তিই হলো দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে শিক্ষাকে সহজলভ্য করা, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ- ভর্তি পরীক্ষা কেন একটি মাত্র স্থানে সীমাবদ্ধ করা হলো, তা বিশ্লেষণ করা অপরিহার্য।

বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় নিছক একটি ক্যাম্পাসভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি একটি দেশব্যাপী বিস্তৃত শিক্ষা নেটওয়ার্ক। বর্তমানে বাউবির রয়েছে ১০টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৬৪টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং ১৪৫৭টিরও বেশি স্টাডি সেন্টার, যা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই সুবিশাল পরিকাঠামো গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্যই হলো শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ এলাকার কাছাকাছি থেকে শিক্ষাসেবা প্রদান করা। ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে টিউটোরিয়াল ক্লাস এবং পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় সহযোগিতার জন্য শিক্ষার্থীরা মূলত এই আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল। এই কেন্দ্রগুলোই বিশ্ববিদ্যালয় এবং দূরবর্তী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। এই কাঠামোটি প্রমাণ করে যে, বাউবির প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সক্ষমতা দেশজুড়ে একযোগে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষভাবে বিন্যাস করা হয়েছে।

বাউবির এমএ/এমএসএস ভর্তি পরীক্ষা কেন্দ্রীভূত করার সিদ্ধান্তটি আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয় যখন প্রতিষ্ঠানটির অন্যান্য প্রোগ্রামের পরীক্ষা পরিচালনার দৃষ্টান্তগুলো পর্যালোচনা করা হয়। একটি উৎকৃষ্ট  উদাহরণ হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব এডুকেশন পরিচালিত ব্যাচেলর অব এডুকেশন (বিএড) প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামের ভর্তি পরীক্ষা দেশব্যাপী বিকেন্দ্রীভূতভাবে বিভিন্ন “বিএড প্রোগ্রামের স্টাডি সেন্টারসমূহে” অনুষ্ঠিত হয়। এটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, বাউবির একাধিক কেন্দ্রে একযোগে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা এবং প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যবস্থা রয়েছে। যদি একটি বৃহৎ ও জনপ্রিয় প্রোগ্রাম যেমন বিএড-এর ভর্তি পরীক্ষা সফলভাবে সারা দেশে আয়োজন করা সম্ভব হয়, তবে এমএ/এমএসএস প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে সেই একই মডেল অনুসরণ না করার পেছনে যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। এই বৈষম্যমূলক নীতিটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতার অভাবকেই প্রকট করে তোলে।

পুরো বাংলাদেশের জন্য একটি মাত্র কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২-এর মূল চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই আইনের প্রস্তাবনাতেই বলা হয়েছে, “সকল পর্যায়ের শিক্ষায় জনগণের প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত ও ত্বরান্বিত” করাই এর উদ্দেশ্য। দূরশিক্ষণের দর্শনই হলো শিক্ষার্থীর দোরগোড়ায় শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়া, শিক্ষার্থীকে শিক্ষার জন্য শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে বাধ্য করা নয়। ভর্তি পরীক্ষার মতো একটি প্রাথমিক ধাপেই যদি একজন শিক্ষার্থীকে তার নিজ বিভাগীয় শহর বা জেলা শহর ছেড়ে গাজীপুরে আসতে বাধ্য করা হয়, তবে তা শিক্ষাকে সহজলভ্য করার পরিবর্তে আরও দুর্লভ ও ব্যয়বহুল করে তোলে। এটি প্রতিষ্ঠানের মূল দর্শনকে কেবল অবজ্ঞা করে না, বরং একে কার্যত উল্টে দেয়।

এই সিদ্ধান্তটি পর্যালোচনায় একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব প্রতীয়মান হয়। একদিকে প্রশাসনিক সরলীকরণ ও ব্যয় সংকোচনের একটি আপাত যৌক্তিকতা থাকতে পারে; একটি মাত্র কেন্দ্র পরিচালনা করা নিঃসন্দেহে অনেকগুলো কেন্দ্র পরিচালনার চেয়ে সহজ। কিন্তু এই “কার্যকরী সুবিধা” অর্জনের প্রচেষ্টা বাউবির মূল লক্ষ্য, অর্থাৎ “প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতা”-কে সরাসরি আঘাত করে। বাউবির মতো একটি দূরশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের জন্য, যার জন্মই হয়েছে প্রচলিত শিক্ষার বাধাগুলো দূর করার জন্য, এই প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতাকে ছাপিয়ে কার্যকরী সুবিধার প্রাধান্য দেওয়া তার অস্তিত্বের সংকট তৈরি করে। যেহেতু এসএসসি, এইচএসসি বা বিএড ইত্যাদি প্রোগ্রামের মাধ্যমে বিকেন্দ্রীভূত পরীক্ষা আয়োজনের সক্ষমতা প্রমাণিত, সেহেতু প্রতি বছর এমএ/এমএসএস প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে এই বিচ্যুতি একটি নিছক লজিস্টিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। বরং এটি একটি গভীরতর প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতির লক্ষণ, যেখানে প্রশাসনিক সুবিধা শিক্ষার্থীর প্রবেশাধিকারের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন সনদের পরিপন্থী।

ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য গাজীপুরে কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থায় অংশ নিতে একজন আবেদনকারীকে উল্লেখযোগ্য ব্যয় বহন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, চট্টগ্রাম থেকে গাজীপুর পর্যন্ত আনুমানিক দূরত্ব ২৬৪ কিলোমিটার, যেখানে নন-এসি বাসে রাউন্ড-ট্রিপ ভাড়া সর্বনিম্ন ১,৪০০ টাকা। সেখানে এক রাতের জন্য সাধারণ মানের হোটেলে থাকার খরচ প্রায় ৮০০ টাকা এবং দুই দিনের খাবার ও স্থানীয় যাতায়াত মিলিয়ে আরও ৮০০ টাকা ব্যয় হতে পারে। ফলে আবেদনকারীর মোট ন্যূনতম ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৩,০০০ টাকা, আর অভিভাবকসহ এ খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৫,২০০ টাকা। সিলেট থেকে গাজীপুরের দূরত্ব প্রায় ২৭৮ কিলোমিটার হলেও খরচের চিত্র প্রায় একই। সেখানেও ন্যূনতম ব্যয় ৩,০০০ টাকা এবং অভিভাবকসহ ৫,২০০ টাকা।

রংপুর ও দিনাজপুর থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যয় আরও বেশি। যথাক্রমে ৩৩৫ ও ৪১৪ কিলোমিটার দূরত্বের রাউন্ড-ট্রিপ বাস ভাড়া ১,৬০০ ও ১,৮০০ টাকা। অন্যান্য ব্যয় ধরা হলে রংপুরের ক্ষেত্রে ন্যূনতম খরচ হয় ৩,২০০ টাকা এবং অভিভাবকসহ ৫,৬০০ টাকা; আর দিনাজপুরের ক্ষেত্রে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৪০০ এবং ৬,০০০ টাকা। খুলনা থেকেও ব্যয় কম নয়; মোট খরচ প্রায় ৩,১০০ টাকা এবং অভিভাবকসহ ৫,৪০০ টাকা। বরিশালের ক্ষেত্রে যাত্রা লঞ্চ বা বাসে হওয়ায় খরচ কিছুটা কম (প্রায় ২,৮০০ টাকা), তবে অভিভাবকসহ ৪,৮০০ টাকা।

সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় পঞ্চগড় থেকে আগত একজন পরীক্ষার্থীর জন্য, যিনি প্রায় ৪৯৪ কিমি দূর থেকে যাত্রা করে গাজীপুর পৌঁছান। এখানে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৩,৪০০ টাকা এবং অভিভাবকসহ ৬,০০০ টাকা। এই হিসাবগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, গাজীপুরে কেন্দ্রীভূত ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ অনেক পরিবারের জন্য একটি আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষত দূরবর্তী অঞ্চল যেমন পঞ্চগড় বা দিনাজপুর থেকে আগত শিক্ষার্থীদের জন্য এই ব্যয় আরও বেশি। ফলে এই আর্থিক বৈষম্য একটি অদৃশ্য ফিল্টার হিসেবে কাজ করবে, যা দূরবর্তী এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিবে।

কেন্দ্রীভূত পরীক্ষার সিদ্ধান্তটি সকল শিক্ষার্থীকে সমানভাবে প্রভাবিত করে না। এর নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত অংশগুলোর ওপর, যাদের জন্য বাউবি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রথমে নারীর বিষয়ে বলতে গেলে বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে, একজন নারীর জন্য একা দূরপাল্লার ভ্রমণ এখনও নানা প্রতিবন্ধকতায় পূর্ণ। নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগ এবং পারিবারিক রক্ষণশীলতার কারণে অনেক নারী আবেদনকারীকে একজন পুরুষ অভিভাবক (বাবা, ভাই বা স্বামী) সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করতে হয়, এর ফলে তাদের খরচ সরাসরি দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই অতিরিক্ত আর্থিক ও লজিস্টিক বোঝা অনেক প্রতিভাবান নারী শিক্ষার্থীকে আবেদন করা থেকেই বিরত রাখতে পারে। এটি কেবল একটি আর্থিক বাধা নয়, এটি নারীর স্বাধীন চলাচল এবং উচ্চশিক্ষার অধিকারে একটি সামাজিক বাধাও বটে।

এছাড়াবাউবির একটি বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থী হলেন কর্মজীবী, যারা চাকরির পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেন। একটি ভর্তি পরীক্ষার জন্য গাজীপুর যেতে হলে তাদের যাতায়াতের সময়সহ কমপক্ষে দুই বা তিন দিনের ছুটি নিতে হয়। বেসরকারি খাতে কর্মরত অনেকের জন্যই এমন আকস্মিক ছুটি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে, এই সিদ্ধান্তটি সেই কর্মজীবী জনগোষ্ঠীকে উচ্চশিক্ষা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে, যাদের সেবা করা বাউবির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

দেশের দূরবর্তী, চরাঞ্চল, হাওর বা পাহাড়ি এলাকার এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য গাজীপুরে আসার খরচ একটি অনতিক্রম্য বাধা। যে শিক্ষার্থীর পরিবারের মাসিক আয় সীমিত, তার পক্ষে একটি ভর্তি পরীক্ষার জন্য ৪,০০০-৫,০০০ টাকা ব্যয় করাও প্রায় অসম্ভব। এই নীতিটি কার্যকরভাবে একটি অর্থনৈতিক মানদণ্ড তৈরি করে, যা শুধুমাত্র সেই সব শিক্ষার্থীদের সুযোগ দেয় যারা এই ভ্রমণের খরচ বহন করতে সক্ষম। এর ফলে, এই নীতিটি কেবল নতুন বাধা তৈরি করে না, এটি সমাজে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বৈষম্যকে আরও তীব্র ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এটি একটি দে ফ্যাক্টো ফিল্টার হিসেবে কাজ করে, যা নারী, কর্মজীবী এবং দরিদ্রদের; যাদের ক্ষমতায়নের জন্য বাউবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল- অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বাদ দেয়। এই নীতির প্রভাব রৈখিক নয়; বরং জ্যামিতিক, কারণ এটি সেই সব বাধাকেই শক্তিশালী করে, যা দূরশিক্ষার মাধ্যমে দূর করার কথা ছিল।

এই ভর্তি পরীক্ষাটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন দেশে করোনা, ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বর্ষা মৌসুম দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং ডেঙ্গুর মৌসুম এখন আরও অনির্দেশ্য ও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এই বছর হঠাৎ করেই করোনা মহামারীর প্রকোপ বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে, হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একটি নির্দিষ্ট শহরে (গাজীপুর) ভ্রমণের জন্য একত্রিত করা একটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। একজন শিক্ষার্থী করোনা, ডেঙ্গু বা অন্য কোনো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে তার শিক্ষাজীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট হতে পারে, এমনকি জীবনও বিপন্ন হতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি প্রণয়নে জলবায়ু পরিবর্তন ও জনস্বাস্থ্যের মতো আধুনিক ঝুঁকিগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া একটি গুরুতর সীমাবদ্ধতা। একটি সম্ভাব্য মহামারী বা রোগের প্রাদুর্ভাবের সময় হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণের জন্য বাধ্য করা একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। এটি প্রমাণ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনায় সমসাময়িক বাস্তবতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। একটি প্রকৃত “শিক্ষার্থীবান্ধব” এবং দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান এই ঝুঁকিগুলো বৃদ্ধি করার পরিবর্তে হ্রাস করার চেষ্টা করবে। এই নীতিটি একটি সেকেলে প্রশাসনিক মানসিকতার পরিচায়ক, যা একবিংশ শতাব্দীর নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট দূরদর্শী নয়।

মোদ্দাকথা হলো, এই কেন্দ্রীভূতকরণের সিদ্ধান্তটিকে সরাসরি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৯২-এর অক্ষর ও চেতনার বিপরীতে রেখে পরিমাপ করতে হবে। আইনের ২(ক) ধারায় “আঞ্চলিক কেন্দ্র” এবং ২(থ) ধারায় “ষ্টাডি সেন্টার”-এর সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যা দেশব্যাপী কার্যক্রম সমন্বয় ও শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদানের জন্যই প্রতিষ্ঠিত। আইনের মূল প্রস্তাবনাতেই শিক্ষাকে “গণমুখী” ও “ত্বরান্বিত” করার কথা বলা হয়েছে। একটি কেন্দ্রীভূত পরীক্ষা ব্যবস্থা এই উদ্দেশ্যগুলোর সরাসরি বিরোধী। এটি শিক্ষাকে গণমুখী করার পরিবর্তে কেন্দ্রমুখী করে এবং প্রবেশাধিকারকে ত্বরান্বিত করার পরিবর্তে বিলম্বিত ও ব্যয়বহুল করে। যে আইন একটি বিকেন্দ্রীভূত কাঠামোকে ভিত্তি করে তৈরি, সেই আইনের অধীনে গৃহীত একটি চরম কেন্দ্রীভূত সিদ্ধান্ত আইনের মূল দর্শনের সাথেই প্রতারণা করে। সুতরাং, এই নীতিটি কেবল শিক্ষার্থীদের জন্য অসুবিধাজনক নয়, এটি আইনগত ও নৈতিকভাবেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্তিত্বের ভিত্তির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা শুধু আমারই পর্যালোচনার বিষয়বস্তু নয়, বরং এই কেন্দ্রীভূত ভর্তি পরীক্ষার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বাউবির দীর্ঘদিনের শিক্ষার্থী-কল্যাণভিত্তিক সংগঠন “ডাক দিয়ে যাই” ফেসবুকে একটি বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে তারা পরীক্ষা স্থগিত করে ১১টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে পরীক্ষা আয়োজনের জোর দাবি জানায়। তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করে, মাস্টার্সে আবেদনকারী অধিকাংশ শিক্ষার্থীই কর্মজীবী ও সাধারণ পরিবারের সদস্য; অনেকে নারী ও গৃহিণী, যাদের জন্য গাজীপুরে গিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অর্থনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন। সংগঠনটি আরও দাবি করে, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে যখন পরীক্ষা আঞ্চলিক কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হতো, তখন সেই সুবিধাটি সকলের জন্য সমানভাবে কার্যকর ছিল; এখন সেটি হঠাৎ করে বন্ধ করে দেওয়া প্রতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শামিল। এই বিবৃতিতে তারা বর্তমান সময়ের মৌসুমি দুর্যোগ, করোনা ও ডেঙ্গুর ঝুঁকি, এবং প্রশাসনিকভাবে ঢাকাবাসীকে গাজীপুরমুক্ত রাখার বিষয়টিকে বৈষম্য হিসেবে চিহ্নিত করে। তারা মনে করে, এই সিদ্ধান্ত বাউবির মূল দর্শন, আইন ও লক্ষ্যকে লঙ্ঘন করে। সংগঠনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আঞ্চলিকভাবে পরীক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলে যে, দাবি উপেক্ষিত হলে তারা মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপি প্রদানের মতো কর্মসূচি গ্রহণ করবে।

Abrarul Hasan

Who is me? Your brother from Bangladesh.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন