একটা কথা বর্তমানে তো আরও বেশি প্রচলিত যে, নবিজি ﷺ রাজনীতি করেছেন ও রাজনীতি করা ইসলামে প্রায় প্রধানতম আবশ্যকতম কাজ। এই জন্য কিছু লোক উলামায়ে কেরামের মধ্যে যারা রাজনীতি করেন না; তাদেরকে আরোপ করেন যে, তারা কেনো এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন না! ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা ফরজ বলেও একটা কথা সমাজে প্রচলিত করা হয়েছে। কিছু কুরআনের আয়াতের নিজ মনমতো ব্যাখ্যা ও প্রথম এক হাজার বছরের মুসলিম বিশ্বের আমলকে না দেখার ভান করে এইসব কার্যক্রমকে এগিয়ে দেয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, ফ্যান্টাসি। এটা গণতন্ত্রের মহান দান। গণতান্ত্রিক দেশগুলি (বর্তমানে পুরো বিশ্ব) ফ্যান্টাসিতে বসবাস করে। তাদের স্বপ্ন হচ্ছে, দুই পা এগুলেই জান্নাতের মত। প্রত্যেকটা সমস্যার একটাই সমাধান বলে নিজের মতকে এগিয়ে দেয়া। মনে করেন, আমি চাচ্ছি যে, লোকেরা গ্রাম্য একটা সামাজিক দল তৈরি করুক। তখন এই বিষয়টাকে প্রমাণ করার জন্য আমি পৃথিবীর সব সমস্যার একক সমাধান হিসেবে বলবো যে, আমাদের গ্রামে একটা সামাজিক দল তৈরি করতে হবে। যখন কেউ নির্বাচনী ইশতেহার দেয়, তাতে সে পুরো দেশের প্রয়োজনীয় সমাধান উল্লেখ করে। কিন্তু বাস্তবতা তো এটাই যে, সে যদিও সবগুলি কাজ করে; দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়না। আমি গণতন্ত্র নিয়ে সমস্যার আলোচনার মধ্যে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
কিছুদিন আগেই একজন পরিচিত আত্মীয়, যিনি কওমি ঘরানার আলিমদের সাথে মিশেন কিন্তু জামায়াতে ইসলামি করেন; তিনি মির্জা ফখরুলকে তাকফির করছিলেন। কারণ, সে বলেছে- কুরআনে কোথাও রাজনীতির কথা নেই। আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, আপনি কি সত্যিই কুরআনে বা হাদিসে রাজনীতি দেখাতে পারবেন? তিনি মুখস্থ জবাব দিলেন, নবিজি সা. রাজনীতি করেছেন। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, রাজনীতি কী; যেটা নবিজি সা. করলেন কিন্তু শব্দে বলতে পারলেন না! কুরআন হাদিসের কোথাও সিয়াসত শব্দের উল্লেখ নেই। অন্য কাজের ব্যাখ্যা হিসেবে যদি সিয়াসতকে দাঁড় করাতে চান, সেক্ষেত্রে অনেক শর্ত আছে। আর এরকম দূরের আলোচনা দিয়ে তাকফির করছেন!
প্রথমে আসি, রাজনীতি কী; সেই প্রসঙ্গে। রাজনীতির সংজ্ঞা নির্ণয় করতে গিয়ে রাজনীতি বিশারদরা (রাজনীতিবিদ নন, রাজনীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ যারা) রাজনীতিকে পানির বিকল্প বানিয়ে ফেলেছেন। মানে, জীবনের অপর নাম পানি নয়, যেন রাজনীতি! তবে সবচেয়ে বিখ্যাত সংজ্ঞার মধ্যে এর আসল বাস্তবতা ধরা পড়ে। হ্যারল্ড ল্যাসওয়েল ১৯৩৬ সালে তার গ্রন্থের নাম দিয়েছিলেন, "রাজনীতি: কে কী কখন কীভাবে পাচ্ছে" (Politics: Who Gets What, When, how), এই বইয়ের নামই পরবর্তীতে রাজনীতির সংজ্ঞা হিসেবে প্রায় বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এই বিষয়টা একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। এই সংজ্ঞা ছাড়াও আরও যেসব সংজ্ঞা রয়েছে, সবগুলোই এটাকে মৌলিকভাবে সমর্থন করে।
ল্যাসওয়েলের বক্তব্যে "কে কী কখন কীভাবে পাচ্ছে" এখানে চারটা বিষয় রয়েছে, যার একটাও নবিজি ﷺ কখনও করার চিন্তা করতে পারেন না। যদি কেউ বলে যে, নবিজি সা. এমনটা করতে চাইতেন; তাহলে আমার মনে হয়না, সে মুসলমান থাকতে পারবে। অজ্ঞাতসারে বা ভুল বুঝে বলার জন্য হয়তো ক্ষমা পাওয়া যেতে পারে; তবে সেটা যা-ই হোক না কেনো পথভ্রষ্টতা তো অবশ্যই।
- কে পাচ্ছে – সমাজে ক্ষমতা বা প্রভাব যারা পায়।
- নবী ﷺ ক্ষমতার জন্য কখনো কোনো লড়াই বা প্রভাব অর্জনের চেষ্টা করেননি। মদিনায় এসে কোনো শাসক পদ দাবি করেননি। তার ক্ষমতায় যাওয়া ছিল সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক বিষয়। তিনি জীবনে কখনো "আল্লাহর রাসুল" ছাড়া কোনো পরিচয় দাবি করেন নাই যে, আমি মদিনার শাসক।
- কী পাচ্ছে – যে সম্পদ, সুযোগ বা সুবিধা বিতরণ করা হয়।
- নবী ﷺ কোনো সম্পদ বা সুবিধা আহরণ বা বিতরণের জন্য কাজ করেননি; তার লক্ষ্য ছিল কেবল ধর্মীয় বিস্তার। তিনি কীভাবে লোভ করতে পারেন! এই ক্ষেত্রটিতে এসে আমার মনে হয়, রাজনীতির সাথে আল্লাহর রাসুল ﷺ কে সম্পৃক্ত করা কুফুরি হবে।
- কখন পাচ্ছে – কখন এই বিতরণ বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
- নবী ﷺ কখনো নিজের সুবিধা বা ক্ষমতা বাড়ানোর সময়সূচি নির্ধারণ করেননি। সব কাজ ছিল নৈতিক ও সমাজকল্যাণমূলক সময় অনুসারে।
- কীভাবে পাচ্ছে – কোন প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি মেনে ক্ষমতা বা সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
- নবী ﷺ কোনো ষড়যন্ত্র, চাপ বা কৌশল ব্যবহার করে ক্ষমতা অর্জন করেননি।
তাহলে যেই প্রশ্নটা সরাসরি আসে, কি ইসলামে বর্তমান রাজনীতির কোনো জায়গাই নেই? ইসলাম কি অপূর্ণ? আসলে এখানে এসে আমরা গণতন্ত্রের চশমাটা পরে ইসলামকে যাচাই করতে যাচ্ছি। কোনো নতুন কিছু যখন সামনে উপস্থাপিত হয়, যেমন টেলিভিশন বা গণমাধ্যম; এখন টেলিভিশন বা গণমাধ্যম সম্পর্কে কুরআন-হাদিসে তথ্য নেই বলে ইসলাম অপূর্ণ হয়ে যাচ্ছেনা। ইসলাম হচ্ছে নীতির ক্ষেত্র। উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। মনে করুন, বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনে অশ্লীলতা নিষিদ্ধ করে আইন রয়েছে। এখন অশ্লীলতা কি টিভিতে হবে, নাকি মোবাইলে হবে, নাকি কোনো যাত্রাপালায় হবে; সেগুলি নেই বলে এটা অপূর্ণাঙ্গ হয়ে যায়নি বা কেউ দাবিও করেনি। তাহলে ইসলামের ব্যাপারে এমন দাবি কেনো করতে হবে?
ইসলামে রাজনীতির জায়গা ঠিক তেমনই, যেমনটা ব্যবসার ক্ষেত্রে। ইসলাম ব্যবসাকে প্রাধান্য দেয় দুনিয়াতে টিকে থাকার জন্য। আল্লাহর রাসুল ﷺ যে ব্যবসায় বরকত থাকার কথা বলেছেন, তার অর্থ এই না যে, কেউ ব্যবসা না করলে তার আখিরাত হারিয়ে যাবে অথবা, এমনকি এটাও না যে, দুনিয়াতে বরকত পাবেনা। ব্যবসায় আগ্রহী করার উদ্দেশ্য হচ্ছে পৃথিবীতে প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা। কিন্তু যদি জিনিসটাকে আপনি বাধ্যতামূলক করতে চান বা এমন করতে চান যে, কেউ ব্যবসা না করলে ভালো মুসলমান না বা খারাপ; সে ব্যবসা করছেনা কেনো; সে ভালো নয়- এই ধরনের চিন্তাধারা হচ্ছে ডিজাস্টারের মূল কারণ।
আপনি যদি মনে করেন, রাজনীতি করে আপনি দুনিয়ায় টিকে থাকতে পারবেন, তাহলে রাজনীতি করতে পারেন। তবে এর জন্য নাজায়েয কাজগুলি জায়েয হয়ে যাবেনা। সবকিছু লিগালাইজ করতে চাওয়াটাও গণতন্ত্রের সমস্যা। মনে করুন, তারা চাচ্ছে- সমকামিতাকেও বৈধতা দেয়া হোক; কেনো? তারা লিগালাইজ না করে কোনো কাজ ব্যক্তিগত পর্যায়েও করবেনা। মানুষ ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক ভুল করতে পারে। এমনকি সমাজে প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণেও কোনও ভুল করতে পারে। গণতন্ত্রের প্রভাবে মুসলিমরাও একই কাজ শুরু করেছেন। আপনি কোনোকিছু ভুল করছেন, তার অর্থ এটা না যে- ইসলামে এটাকে আগে জায়েয করে নিতে হবে। মুসলিম ভাইয়ের সাথে শত্রুতা হারাম, মুসলিম ভাইকে ধোঁকা দেয়া হারাম; ইত্যাদি মাসয়ালা উপেক্ষা করে রাজনীতি করতে হয়। এগুলোকে জায়েয করার জন্য মুসলিম ভাইকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়ার অর্থ নেই।
রাজনীতিকে ইসলামিকরণ করা বৈধ হতে পারেনা। এটা নিকৃষ্টতম বিদআত। কারণ, এর ফলে মানুষ ইসলামের নামে শত্রুতা করছে, যাতে দ্বীনি কোনো মাকসাদ নেই। আলি রাযি. ও মুয়াবিয়া রাযি. এর মধ্যে বিরোধ ছিল, কিন্তু সাহাবিরা এই বিরোধিতার জন্য কুরআন-সুন্নাহর যা-তা ব্যাখ্যার আশ্রয় নেননি। যারা নিয়েছিল, তাদেরকে খারিজি বলে গোমরাহদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। আপনি রাজনীতি করছেন, আপনার মাকসাদ যদি দ্বীন হয়, তার অর্থ এই না যে, যার মাকসাদ দুনিয়া, তাকে আপনি কুরআন হাদিসের আয়াত দেখিয়ে তাকফির করবেন।
সবচেয়ে বড় সমস্যা সৃষ্টি হয় বর্তমান যুগে গণতন্ত্র নিয়ে। কিছু লোকের মতে, এটা কুফর। আমি এটা নিয়ে কখনো বিস্তারিত লিখবো। তবে গণতন্ত্র দিয়ে তো আপনিও রাজনীতি করছেন, এই ক্ষেত্রে এসে আরেকজনকে আপনি তাকফির করতে পারেন না। ইসলামে রাজনীতির অবস্থান অনেক নীচে, এটাকে উপরে আনার কোনো অর্থ নেই যে, কেউ ধর্মীয় রাজনীতি করতে না চাইলে তার বিরোধিতা করবেন।